ইসলাম যাদের বিয়ে করা বৈধ ও অবৈধ করেছেন

আমরা মুসলিম। আমরা সামাজিক প্রাণী। কুরআন আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের উপর বিয়েকে হালাল করেছেন। সেই সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ককে  হারাম করেছেন। বিয়েই হলো সেই উত্তম পন্থা যার মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে উঠতে পারে। বিয়ে করার মধ্য দিয়েই সুখ শান্তি লাভ করা যায়।

শুধু ইসলাম ধর্মেই নয়, প্রতিটি ধর্ম, প্রতিটি জাতি তাদের মনের আত্মিক শান্তি লাভ করেছে পরিবার গঠনের মধ্য দিয়েই। 

যুগে যুগে আল্লাহ্‌র প্রেরিত নবী এবং রাসুলগন বিয়ে করার মাধ্যমে একত্রে বসবাস করেছেন, সন্তান-সন্ততির জন্ম দিয়েছেন। আল্লাহ্‌ এর নির্দেশেই তারা পরিবার গঠন করেছেন। একটা সভ্য সমাজ গড়তে হলে, বংশ বৃদ্ধি করতে হলে বিয়ে করা বাঞ্ছনীয়। 

বিয়ে করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত অনেক সুবিধা পান দম্পতিরা। কেননা ভালো যৌনজীবন তাদের সন্তুষ্টি ও সুখের একটি সম্পূর্ণ অনুভূতি প্রমাণ করে। তবে বিয়ে শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে মানসিক স্বাস্থ্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। মানসিক চাপ কমায়। এটা পুরুষের হৃৎপিণ্ডের জন্য খুবই উপকারী। তাই অবিবাহিত পুরুষদের তুলনায় বিবাহিতদের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও অন্য রোগের ঝুঁকি কম থাকে। মহিলা এবং পুরুষ উভয়ের জীবনে বিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, “আপনার পূর্বে আমি অনেক রসূল প্রেরণ করেছি এবং তাঁদেরকে পত্নী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছি। কোন রসূলের এমন সাধ্য ছিল না যে আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করে। প্রত্যেকটি ওয়াদা লিখিত আছে।” (সুরা রা’দ, আয়াতঃ ৩৮)।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন- “হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা, আয়াতঃ ০১)

তবে, বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু বিধান রয়েছে। অবৈধ নারীকে অথবা অবৈধ নিয়মে বিবাহ করে সংসার করলে ব্যভিচার করা হয়। এ ব্যাপারে ইসলামে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। 

বিয়ে করার ক্ষেত্রে রক্তের সম্পর্ক-

নারী-পুরুষের মাঝে রক্তের সম্পর্ক থাকলে তাদের মধ্যে বিয়ে হারাম। এরা হলঃ 

১- পুরুষের পক্ষে তার মা, দাদী, নানী এবং নারীর পক্ষে তার বাবা, দাদা ও নানা।

২- পুরুষের পক্ষে তার কন্যা এবং নাতনি (কন্যার মেয়ে ) ও পুতনি (নাতনির মেয়ে), আর নারীর পক্ষে; তার পুত্র (ছেলে) এবং নাতি (পুত্রের ছেলে) ও পুতা (নাতির ছেলে)।

৩- পুরুষের পক্ষে তার বোন, দুধ বোন, বোনঝি, ভাইঝি ও তাদের মেয়ে, ভাইপো ও বোনপোর মেয়ে। আর নারীর পক্ষে তার ভাই, দুধ ভাই, ভাইপো, বোনপো ও তাদের ছেলে এবং ভাইঝি ও বোনঝির ছেলে।

৪- পুরুষের পক্ষে তার ফুপু এবং নারীর পক্ষে তার চাচা।

৫- পুরুষের পক্ষে তার খালা (মায়ের সহোদরা, বৈপিত্রেয়ী বা বৈমাত্রেয়ী বোন) এবং নারীর পক্ষে তার মামা (মায়ের সহোদর, বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয় ভাই)। উল্লেখ্য যে সৎ মায়ের বোন (সৎ খালা) পুরুষের জন্য এবং সৎ মায়ের ভাই (সৎ মামা) নারীর জন্য হারাম বা মাহরাম নয়। এদের মধ্যে বিয়ে বৈধ।

৬- পুরুষের পক্ষে তার বাবা-মায়ের খালা বা ফুপু এবং নারীর পক্ষে তার বাবা-মায়ের চাচা বা মামা অবৈধ।

পুরুষের জন্য খালাতো, মামাতো, ফুফাতো বা চাচাতো বোন তাদের মধ্যকার কেউ নন। অতএব, তাদেরকে বিবাহ করা বৈধ। আবার পুরুষের পক্ষে; তার (মামার মৃত্যু বা তালাকের পর) মামী, (চাচার মৃত্যু বা তালাকের পর) চাচী এবং নারীর পক্ষে তার (খালার মৃত্যু বা তালাকের পর) খালু (ফুফুর মৃত্যু বা তালাকের পর) ফুপা বৈধ ।

রক্তের সম্পর্ক যদি কৃত্রিম হয়, তবে বিবাহ হারাম নয়। সুতরাং (রোগিনীকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে তাকে বিবাহ করা রক্তদাতা পুরুষের জন্য অবৈধ নয়। অনুরূপ  স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে রক্ত দান করলে বিবাহের কোন ক্ষতি হয় না। 

‘দুধমা”  সাব্যস্ত হলে তার সাথে এবং রক্ত-সম্পর্কীয় অন্যান্য আত্মীয়র ন্যায় ঐ মায়ের বংশের সকলের সাথে বিবাহ অবৈধ হবে।

বিয়ে করা যাদের হারাম-

০১. স্ত্রীদের মা (শাশুড়ি) স্বামীর জন্য হারাম। এতে স্ত্রীদের নানি, দাদি সবার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য।

০২. নিজ স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহের পর সহবাস করার শর্তে ওই স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যাকে বিবাহ করা হারাম।

০৩. পুত্রবধূকে বিয়ে করা হারাম। পুত্র শব্দের ব্যাপকতার কারণে পৌত্র ও দৌহিত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করা যাবে না।

০৪. দুই বোনকে বিবাহের মাধ্যমে একত্র করা অবৈধ, সহোদর বোন হোক কিংবা বৈমাত্রেয়ী বা বৈপিত্রেয়ী হোক, বংশের দিক থেকে হোক বা দুধের দিক থেকে হোক- এ বিধান সবার জন্য প্রযোজ্য। তবে এক বোনের চূড়ান্ত তালাক ও ইদ্দত পালনের পর কিংবা মৃত্যু হলে অন্য বোনকে বিবাহ করা জায়েজ।

বিয়ে করার ক্ষেত্রে কুফর ও শির্ক-

কোন মুসলিম (নারী-পুরুষ) কোন কাফের বা মুশরিক (নারী-পুরুষ)-কে বিবাহ করতে পারে না। অবশ্য ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলে তার সাথে বিবাহ বৈধ। এ ব্যপারে মহান আল্লাহ বলেন,

“মু’মিন নারীগণ কাফের পুরুষদের জন্য এবং কাফের পুরুষরা মু’মিন নারীদের জন্য বৈধ নয়…।” 

(সূরা আল-মুমতাহিনা)

পক্ষান্তরে আসমানী কিতাবধারী ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান সচ্চরিত্র নারীকে (ইসলাম গ্রহণ না করলেও) মুসলিম পুরুষ বিবাহ করতে পারে। (সূরা আল-মায়িদা)

বিয়ে করার ক্ষেত্রে সাময়িক ভাবে নিষিদ্ধ মহিলা-

সাময়িক কারণে কখনো কখনো কোন কোন মহিলাকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ হয়ে থাকে। উক্ত কারণ দূর হয়ে গেলে তাকে বিবাহ করা বৈধ হবে।

১. কোন মহিলাকে বিবাহ করলেই তার আপন বোন, ফুপু, খালাকে বিবাহ করা হারাম গণ্য হবে। তবে, তাকে যখন তালাক দিয়ে দেবে কিংবা, স্বামী মারা যাবে এবং সে ইদ্দত শেষ করবে, তখন তাকে সে বিবাহ করতে পারবে।

২. যে মহিলা অন্যের বিবাহাধীনে ছিল। তাকে স্বামী তালাক দিয়েছে কিংবা মারা গেছে এবং সে ইদ্দত পালন করছে; এমতাবস্থায় তাকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলেই বিবাহ করতে পারবে।

 পরিশেষে, আল্লাহ আমাদের কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে যাদের বিবাহ করা হারাম, তাদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে আল্লাহ বিধানের প্রতি আমল করার তাওফিক দান করুন। ইসলামী হুকম-আহকাম মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Share on

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.