বিবাহিত জীবনে কেন অশান্তি আসে?

বিয়ের পরে সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক ভালবাসা, আন্তরিকতা, প্রেম, মায়া-মহব্বত হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে শুরু হয় মনমালিন্য, একে অপরের প্রতি অশ্রদ্ধা, অভিমান অবশেষে ডিভোর্স।

কেন দাম্পত্য জীবনে এই অশান্তি? অথচ মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন বিয়ে সম্পর্কে বলেছেন,

“আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা রুম : আয়াত ২১)

অর্থাৎ বিয়ের দ্বারা মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করে দিবেন এর জন্য আমাদেরকে মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন এর কাছে দোয়া করতে হবে। মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের দয়া ব্যতিত বিবাহিত জীবনে শান্তি সম্ভব নয়।
তারপরও আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। আল্লাহ্‌র হুকুম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ মোতাবেক বিয়ের পর্বগুলো সম্পন্ন করতে হবে। তাহলে আশা করা যায় যে, তিনি আমাদের জন্য শান্তির ফয়সালা করে দিবেন।

বিয়েতে যেসব কারণে অশান্তি হতে পারে বা যেসব বিষয়ে সতর্ক হওয়া দরকার তা নিয়ে আমাদের নিজেদের কিছু অভিজ্ঞতার কথা আপনাদেরকে জানাচ্ছি যাতে আমরা সচেতন হতে পারি।

বিয়ের সময় তথ্য গোপন করাঃ

বিয়ে সম্পর্কিত কুরআন কয়েকটি আয়াতমেয়ের বাবা মেয়ে বড় হওয়ার পর থেকে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠে। মেয়ে যেন সংসারের বোঝা, তাকে বিদায় না করা পর্যন্ত যেন সবার ঘুম হারাম হয়ে যায়। তাই বিয়ের ব্যপারে কোন প্রতিষ্ঠিত, ভাল ছেলে পেলেই তার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। আর পাত্র পক্ষ যখন পাত্রী সম্পর্কে কোন তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করে তখন মেয়ের অভিভাবকেরা তথ্য গোপন করে। আর এর ফলে যখন বিয়ের পরে সব জানাজানি হয়ে যায় তখন শুরু হয় অশান্তি, একে অপরের প্রতি অশ্রদ্ধা। যার ফলে অশান্তির আর সীমা থাকেনা।

একইভাবে কোন পাত্র পক্ষ যখন পাত্রী পক্ষের কাছে তথ্য গোপন করে বা কম-বেশি করে উপস্থাপন করে তখনও একই অবস্থা শুরু হয়।
অনেক ক্ষেত্রে কেউ মেনে নিয়ে চলার চেষ্টা করে কিন্তু সুযোগ পেলেই শুরু হয় বাক-বিতন্ডা।

 

বর-কনে সম-পর্যায়ের না হওয়াঃ

বিয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপুর্ন বিষয় হল, উভয় পক্ষের মধ্যে সম-পর্যায়ের বা কাছাকাছি হওয়া।
যেমন, পাত্র- পাত্রীর বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, উচ্চতা, বংশ, সম্পদ , ইত্যাদি ব্যাপারে সামঞ্জস্য থাকা।
কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় আবেগপ্রবণভাবে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় বা তথ্য গোপন করা হয়। যার ফলে বিয়ের পরে অনেক কিছুই মিলে না, শুরু হয় মনোমালিন্য। যেমন, অনেক ধনী লোকের সন্তান এর সাথে গরীবের বিয়ে বা উচ্চশিক্ষিত ছেলের সাথে অশিক্ষিত বা অনেক কম শিক্ষিত মেয়ের বিয়ে। পারিবারিক মর্যাদার দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ।

আর এসব কারণে শুরু হয় আরেক ধরনের অশান্তি। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে এই সমতার বিষয়টি খুব খেয়াল রাখা উচিত।

বিয়েতে সমতা প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেনঃ তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ করো এবং সমতা (কুফু) বিবেচনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো। [সুনানে ইবনে মাজাহঃ ১৯৬৮, বিয়ে পর্ব]

পাত্রের আর্থিক এবং শারীরিক যোগ্যতার ব্যাপারে সচেতন না থাকাঃ
বিয়ের জন্য একজন পুরুষকে অবশ্যই আর্থিক এবং শারীরিকভাবে যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে অর্থাৎ আর্থিকভাবে সংসারের ভরণপোষণের যোগ্যতা যেমন থাকতে হবে ঠিক তেমনি শারীরিকভাবে যোগ্য হতে হবে। সন্তান উৎপাদন এবং লালন পালনের জন্য একজন পাত্রীরও অনুরূপ যোগ্যতা থাকতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারাই স্ত্রীর অধিকার আদায়ে সামর্থ্য রাখে, তারা যেন অবশ্যই বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়”। (বুখারি)
এই আর্থিক এবং শারীরিক যোগ্যতা না থাকলেও অশান্তি শুরু হয়, যা ডিভোর্স পর্যন্ত গড়ায়।

বিয়ের পূর্বে যৌতুক-উপহার এর পাশাপাশি দেনমোহরের এর ব্যাপারেও স্পষ্ট আলোচনা না থাকলেঃ

বিয়েতে যৌতুক বা উপহার দেওয়া বা নেওয়ার ব্যাপারে ইশারা ইঙ্গিতে অনেক কিছুই পাত্রী পক্ষ বলে থাকে বা আশ্বাস দিয়ে থাকে, কিন্তু বাস্তবতার সাথে অনেক ক্ষেত্রেই তার খুব মিল পাওয়া যায় না। এসব ব্যাপারেও মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়।
অপরদিকে দেনমোহরের ব্যাপারটিতে আরও অবহেলা করা হয়। পুর্ব প্রস্তুতি বা আলোচনা ছাড়াই বিয়ের আসরে দেনমোহরের ব্যাপারে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। কনে পক্ষে বলে একরকম, আর বর পক্ষে বলে একরকম। ফলাফল, বাক বিতন্ডার পরে   সমঝোতার মাধ্যমে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও বর পক্ষকে পূর্ন স্বাধীনতা দিতে হবে, তাকে চিন্তা ভাবনা করার সময় ও সুযোগ দিতে হবে। বিয়ের দিনের পূর্বেই উভয় পক্ষ বসে দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারন করতে হবে।
কারণ দেনমোহর একটি অবশ্যই প্রদেয় ঋণ।
তাই বিয়েতে যেমন যৌতুক বা উপহার দেওয়ার ব্যাপারে মিথ্যা আশ্বাস বা অতিরঞ্জিত কিছু বলা ঠিক হবেনা, একইভাবে দেনমোহরের ব্যাপারেও পূর্ব থেকে আলোচনা করে, বরের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে যাতে সহজেই তা আদায় করতে পারে।

উভয়কে আলোচনার  পর্যাপ্ত সময় সুযোগ না দেওয়াঃ

ছেলে-মেয়ের অমতে বিয়ে দিলে বা জোর করে বিয়ে দিলে সবচেয়ে বেশি অশান্তি শুরু হতে পারে।
আমরা অনেক সময় শিক্ষিত আর প্রতিষ্ঠিত ছেলে পেলে মেয়ের অমতে বা তাঁর কোন মতামতকে গুরুত্ব না দিয়েই বিয়ে দিয়ে দেই। কিন্তু মেয়েটি বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বিয়েকে মেনে নেয়। অথচ তাঁর অন্তরে বাস করছে অন্য কেউ, এর ফলে অন্তর দিয়ে সে তাঁর স্বামীকে মেনে নিতে পারেনা। আর এই দূরত্ব এক সময় জীবনে অনেক বড় ক্ষতি বয়ে আনে।
তাই বিয়ের পূর্বে ছেলে-মেয়ের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা করার সুযোগ দিতে হবে। একই ঘটনা ছেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

অতএব, আমাদের বিয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্ব প্রদান করতে হবে, তাহলে আমরা আশা করতে পারি আমাদের বিবাহিত জীবন শান্তির হবে, সফল হবে। এছাড়া, দাম্পত্য জীবনে খারাপ সম্পর্কে থেকে বের হতে হলে এই ব্লগ থেকেও কিছু পরামর্শ পেতে পারেন।

Share on

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.