পরিবার কেন ছেলেদের বিয়েতে এত উদাসীন?
একই পরিবারের মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত বাবা-মা যতটা চিন্তিত দ্রুত বিয়ে দেওয়ার জন্য বিপরীতে ঐ পরিবারের ছেলের বিয়ের জন্য ততটাই উদাসীন।
পরিবার কেন ছেলেদের বিয়েতে এত উদাসীন?
বাবা-মা ছেলেদের বিয়েতে উদাসীন এই কথাটা পুরোপুরি ঠিক না।
অসলে ছেলে বা মেয়ে সবার বিয়ের ক্ষেত্রেই মা বাবার অনেক ভাবনা থাকে।
তবে মেয়েদের নিয়ে একটু বেশি চিন্তিত থাকে। কারন মেয়েকে অন্য একজনের বাড়িতে পাঠাতে হয়। সেখানে মেয়ে কেমন থাকবে এটা মা-বাবাকে অনেক ভাবনার মধ্যে ফেলে দেয়।
অন্যদিকে, সামাজিকভাবে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়ার একটা প্রবনতা দেখা যায়, যদিও এটা ঠিক না। ফলে মা বাবার মধ্যে মেয়েকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দেওয়ার বাড়তি মনোভাব তৈরি হয়। যেটা ছেলেদের ক্ষেত্রে কম দেখা যায়।
এছাড়া আরো অনেক কারনে বাবা -মা ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বেশি ভাবনার মধ্যে পড়েন। ব্যক্তি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থানুসারে এই প্রবনতা কম বেশি হতে পারে।
ছেলেকে বিয়ে করানোর ব্যাপারে সব পরিবার উদাসীন নয় তবে বেশিরভাগ পরিবার উদাসীন।
কেন উদাসীন?
তাই নিয়ে নিজস্ব আশেপাশের কিছু মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে এই আলোচনা।
সাংসারিক নিয়ন্ত্রণঃ
বিয়ের সাথে সাথে সংসারের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা পরিবর্তন আসে। যেমন, ছেলে বিয়ে করলে তাঁর স্ত্রী সংসারের নতুন সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ন সদস্য। কিছুদিন স্ত্রী হয়তো শ্বশুর বা শাশুড়ির নিয়ন্ত্রনে চলবে কিন্তু এরপরেই সে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। ফলে, পরিবারের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সমস্যা আসে, তবে অনেকেই এটা সহজভাবে নেয়। সংসারে নতুন কেউ এসে সমস্যা সৃষ্টি করুক- তাই হয়তো কিছু পরিবারে ছেলের বিয়েতে একটু উদাসীন থাকে।
আর্থিক নিয়ন্ত্রণঃ
সংসারের অর্থ ব্যবস্থা বেশির ভাগ সময় নিয়ন্ত্রণ করে বাবা-মা অথবা ছেলে নিজে। কিন্তু বিয়ের পরে এই ব্যবস্থার মধ্যেও পরিবর্তন আসে, আসবে। স্ত্রী চাইবে তাঁর স্বামীকে তাঁর মতন করে চালাতে। অন্যদিকে বাবা-মা চাইবে ছেলেকে নিজের মতন করে পূর্বের মতন চালাতে। এসব চিন্তা করেও অনেক সময় ছেলেদের বিয়েতে বাবা-মা কিছুটা বিলম্ব বা চিন্তিত থাকে।
সন্তানের নিয়ন্ত্রণঃ
ছেলে বিয়ে করলেই বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হলেও সন্তানের প্রতি কমে যাবে। সন্তানের চিন্তা-ভাবনা, চলাফেরা ইত্যাদিতে স্ত্রীর পরামর্শ আসবে। ফলে বাবা-মায়ের সাথে দুরুত্বও সৃষ্টি হতে পারে। শেষ বয়সে বাবা-মাকে ভরণ পোষণে সন্তান কি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে কিনা- নানাবিধ বিষয় বাবা-মায়ের বা পরিবারের সবার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। তবে এরপরেও বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতেই হয়।
অনেক মা-বাবা অবচেতনভাবে ভয় পান যে, ছেলে বিয়ে করলে বদলে যাবে বা তাদের থেকে দূরে সরে যাবে। বিশেষ করে যদি পরিবারটি ছেলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে অবচেতন মনে তারা বিয়েকে একটু পিছিয়ে দিতে চান
সেটেল হওয়ার চিরাচরিত ধারণাঃ
পরিবারের চোখে একটি ছেলের বিয়ের প্রধান শর্ত হলো তার ক্যারিয়ার। মা-বাবা মনে করেন, ছেলে যত বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে, তত ভালো পরিবার থেকে তার সম্বন্ধ আসবে। অনেক সময় দেখা যায়, ছেলে ভালো আয় করছে তবুও পরিবার ভাবছে, “আরেকটু সময় যাক, আরেকটু গুছিয়ে নিক।” এই ‘আরও ভালো করার’ নেশায় পরিবারের কাছে ছেলের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা বয়স গৌণ হয়ে পড়ে।
দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহঃ
বাবা-মায়ের কাছে সন্তান সব সময় ছোটই থাকে। তারা মনে করেন, বিয়ে মানে একটি বিশাল দায়িত্ব। ছেলে নিজের টুকটাক কাজ বা আর্থিক দিক সামলাতে পারলেও, সে কি একটি নতুন মানুষকে আগলে রাখতে পারবে? এই সংশয় থেকে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।
“ছেলের আবার বয়স কী?”—এই ভুল ধারণাঃ
সামাজিকভাবে একটি ধারণা প্রচলিত যে, মেয়েদের বয়স বাড়লে বিয়ের সমস্যা হয়, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা নয়। এই ধারণা থেকে পরিবার মনে করে, ৪০ বছরেও ছেলের বিয়ে দেওয়া যাবে, তাই তাড়াহুড়ো করার কী দরকার! অথচ তারা ভুলে যান যে, সময়ের সাথে সাথে মানসিক ও শারীরিক চাহিদার পরিবর্তন ঘটে।
উদাসীনতা নাকি সংকেত বুঝতে না পারা?
ছেলেরা সাধারণত মেয়েদের মতো করে বিয়ের কথা সরাসরি বা আবেগ দিয়ে পরিবারকে বলতে পারে না। অনেক পরিবার মনে করে, “ছেলে তো কিছু বলছে না, তার মানে সে হয়তো এখন বিয়ে করতে চায় না।” এই যোগাযোগের অভাবকেই অনেক সময় উদাসীনতা বলে মনে হয়।

আপনার জন্য কিছু পরামর্শ:
যদি আপনি মনে করেন আপনার পরিবার আপনার বিয়ের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না, তবে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
স্পষ্ট কথা বলুন: সরাসরি কথা বলা কঠিন মনে হলে পরিবারের কোনো বড় বা নির্ভরযোগ্য সদস্যের (যেমন বড় ভাই, বোন বা খালা) মাধ্যমে আপনার ইচ্ছার কথা বাবা-মাকে জানান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখান: আপনি যে মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে একটি নতুন জীবন শুরু করতে সক্ষম, সেটি তাদের বুঝিয়ে বলুন।
সময় নির্ধারণ করুন: তাদের কাছে জানতে চান তারা ঠিক কত সময় পর আপনাকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত মনে করবেন। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে আপনার মনে অনিশ্চয়তা কমবে।
বিয়ে কেবল একটি সামাজিক বন্ধন নয়, এটি জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। পরিবারের এই উদাসীনতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবহেলা নয়, বরং অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ভুল সামাজিক ধারণা থেকে আসে।
বাবা-মা বা অভিভাবকদের বলবো, আপনার সন্তানকে বিয়ে দিতেই হবে। তাই যদি সময়মত বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তাহলে ঐ সন্তান আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, অন্তর থেকে সম্মান করবে।
